Wednesday, 14 March 2018

পলাশীর হৃদয়বিদারক দিন ও ষড়যন্ত্রকারীদের নির্মম পরিণতি


আমাদের দায় পলাশী :
২৩ জুন ঐতিহাসিক পলাশী দিবস। আজকের প্রজন্ম যেখানে নিকটবর্তী ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ভুলতে বসেছে অথবা তাদেরকে আসল ইতিহাস বাদ দিয়ে অন্য এক ইতিহাসের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে তখন তো ১৭৫৭ সালের পলাশী ট্রাজেডির ব্যাপারে কোন কথাই নেই। যেখানে ৫২ ভাষা আন্দোলন নিয়ে প্রশ্ন করা হলে আগামীর কর্ণধার  প্রজন্ম বলে এক মহা যুদ্ধের কথা সেখানে তাদেরকে যদি বলা হয় পলাশীর আম্রকাননের কথা তাহলে ঢাকার আজিমপুরের পাশে পলাশী নামক স্থানের কথা ছাড়া খুব বেশি যে বলতে পারবে তা মনে হয় না। এর পেছনে অবশ্য কারণও রয়েছে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার অপরিণত পরিবর্তন , অসুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ, অতিমাত্রায়  রাজনীতিকীকরণ, অন্যের অনুসারে পরিচালিত জীবনাচার সামাজিক সমচেতনতাবোধের অভাব। কারণের পেছনের কারণ খোঁজা হলে হয়তবা আরও অনেক ব্যকরণ উঠে আসবে কিন্তু তা না করে জাতির সামগ্রীক চেতনাবোধের জায়গাকে আরও পরিশীলিত করার জন্য প্রয়োজন এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন। জাতিকে তার আসল ইতিহাস সম্পর্কে সজাগ করা ইতিহাসের নির্মম পরিণতি সম্পর্কে সচেতন করা। এক্ষেত্রে জনগণের দায়িত্বশীল হিসেবে সরকারকেই এগিয়ে আসতে হয় প্রথম।

ইতিহাস কথা বলে :
ইতিহাস নাকি সব সময় বিজয়ীদের পক্ষেই থাকে। কথা কিন্তু সত্য - তবে ইতিহাস কিন্তু নিজেকে (ইতিহাসকে) অস্বীকার করে না। বিজয়ীদেরকে যেমন নায়কের ভুমিকায় দেখায় আবার বিজয়ের নেপথ্যে হীনকাজ কারবারীদেরকে খলনায়কের ভুমিকায় নামিয়ে আনে। ২৩ জুনের ইংরেজদের বিজয়ের জন্য নায়কের ভুমিকায় থাকা মীর জাফরকে ইতিহাসই আজ টেনে হিঁচড়ে নায়কের জায়গা থেকে নামিয়ে যোজন যোজন দূরত্বে নিয়েছে। তাকে আজ ঘৃণাভরে স্মরণ করা হয়। এমনকি মানুষ মানুষকে গালি দেওয়ার সময় তার নাম উচ্চারণ করে। অপরদিকে পরাজয়ের গ্লানিমাথায় নির্মম মৃত্যুর পরও ইতিহাস নায়কের  আসনে সমাসীন করেছে বাংলা, বিহার, উরিষ্যার শেষ নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাকে। নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা আজ এক মাথা উঁচু রাখা বীরের নাম।

অস্তমিত স্বাধীনতার সূর্য্য:
মূলত আলীবর্দী খাঁর থেকেই নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার অধ্যায় শুরু। নাবাব আলীবর্দী খানের কোন পুত্র সন্তান ছিল না। এদিকে তাঁর (নবাব আলীবর্দী খানের ) সিংহাসণারোহণের স্বল্প সময়ের ব্যবধানে মারা যায় তার এক দৌহিত্র দ্ইু জামাতা। তাই তিনি মৃত্যুর পূর্বেই তার কনিষ্ঠ কন্যার পুত্র প্রিয় দৌহিত্র সিরাজউদদৌলোকে বাংলার পরবর্তী নবাব মনোনীত করে যান। ১৭৫৬ সালের ১০ই এপ্রিল ৮০ বছর বয়সে নবাব আলীবর্দী খাঁন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার পর ১৭৫৬ সালের এপ্রিল মাসে তারই মনোনীত প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র সিরাজ-উদ-দৌলা সিংহাসনে বসেন মাত্র তেইশ বছর বয়সে। একদিকে তার অল্প বয়স অপরদিকে তার সিংহাসণারোহণের কারণে অনেকের সিংহাসণারোহণের স্বপ্ন ধুলিস্যাৎ হয়ে যাওয়া দেখে তার বিরোদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হয়। ষড়যন্ত্রকারীদের মধ্যে নবাব আলীবর্দী খাঁর জ্যেষ্ঠা কন্যা মেহেরুন্নেসা ওরফে ঘসেটি বেগম অন্যতম। অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রের সুযোগে ইংরেজরা তাদের কূটকৌশলকে কাজে লাগায়। ষড়যন্ত্রকারী শওকত জঙ্গ ঘসেটি বেগমের পক্ষাবলম্বন করে নবাবকে চিরাচরিত রীতি অনুযায়ী কোন উপঢৌকান পাঠানো থেকে বিরত থেকেই ক্ষান্ত হয় নি বরং ইংরেজদের ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নবাবের অবাধ্য সবাইকে আশ্রয় প্রদান করে। ইউরোপে সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধের (১৭৫৬-১৭৬৩) অজুহাতে ইংরেজ ফরাসি বণিকরা বাংলায় দুর্গ নির্মাণ শুরু করে। নবাব সংবাদ জানতে পেরে তাদের নিরস্ত্র হতে এবং দুর্গ নির্মাণ বন্ধ করার আদেশ দেন। ফরাসিগণ নবাবের নির্দেশ মত দুর্গ নির্মাণ বন্ধ করলেও উদ্ধত ব্রিটিশ বণিকরা নবাবের আদেশ তো মানেইনি ; উপরন্তু তাঁর দূতকে তারা অপমান করতেও দ্বিধা করেনি। ইংরেজ নাবাবের মধ্যে ষড়যন্ত্রকারীদে মাধ্যমে দূরত্ব বাড়তে থাকলে তিনি ষড়যন্ত্রকারীদের মূল হোতা তার খালা ঘসেটি বেগমকে আটক করেন। সময় ইংরেজরা নবাবের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের ব্যাপারে আগ্রহী হলেও তারা দূর্গ নির্মাণ বন্ধের কোন তৎপরতা দেখায় নি। ১৭৫৭ সালে ইংরেজদের সাথে সমন্বয় করে ২৩ এপ্রিল কোলকাতা পরিষদ নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাকে ক্ষমতাচ্যুত করার প্রস্তাব করে। ইংরেজ সেনাপতি রবার্ট ক্লাইভ গোপন আতাঁত করে সিরাজ-উদ দৌলার সেনাপতি মীরজাফরের সাথে। নবাব তা বুঝতে পেরে মীরজাফরকে পদ থেকে অপসারণ করলে কূটকৌশলে পারদর্শী মীরজাফর কুরআন ছুয়ে শপথ গ্রহণ করে নিজ পদ ফেরৎ পায়। সমসাময়িক ঐতিহাসিকরা বলেন, এই ভুল সিদ্ধান্তই নবাব সিরাজের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। ঘটনার পরম্পরায় মীরজাফরের সিংহাসন লাভের বাসনা ইংরেজদের পুতুল নবাব বানানোর পরিকল্পনা, ঘষেটি বেগমের সাথে ইংরেজদের যোগাযোগ, নবাবের নিষেধ সত্ত্বেও ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ সংস্কার কাজ অব্যাহত রাখা, কৃষ্ণ বল্লভকে ফোর্ট উইলিয়ামে আশ্রয় প্রদান প্রভৃতি কারণে ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশীর আমবাগানে সকাল সাড়ে ১০টায় ইংরেজ নবাবের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। নবাব সিরাজ-উদ- দৌলার পক্ষে ৫০,০০০ সৈন্য অংশ গ্রহণ করে ইংরেজদের হয়ে মাত্র তিনহাজার সৈন্য অংশ নেয়। ইংরেজ কর্তৃক পূর্ণিয়ার শওকত জঙ্গকেসাহায্য করা, মীর মদন মোহনলালের বীরত্ব সত্ত্বেও জগৎশেঠ, রায় দুর্লভ, উমির চাঁদ, ইয়ার লতিফ প্রমুখকুচক্রী মহলের প্রাসাদ ষড়যন্ত্র   বিশ্বাসঘাতকতার ফলে নবাবের পরাজয় ঘটে। সেইসাথে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য  পৌনে দু বছরের জন্য অস্তমিত হয়।

বিশ্বাসঘাতকদের করুণ পরিণতি:
অস্বাভাবিক মৃত্যু বিচারহীন মৃত্যু কারই কাম্য না হলেও ইতিহাস তার নিজস্ব ব্যবস্থার মাধ্যমে কখনো কখনো ফয়সালা নিয়ে থাকে এভাবে দেখলে কিছু বিষয়কে ব্যাখ্যা করা যায় এভাবে যে- ইতিহাস বিশ্বাসঘাতকদের ক্ষমা করে নি। যারা বিশ্বাবসঘাতকতা করেছে তাদের মৃত্যু স্বাভাবিক হয় নি। মীর জাফর- সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে বিশ্বাসঘাতকতার। সে সামান্য সময়ের জন্য নবাব হলেও তাকে তার জামাতা মীর কাসেম ক্ষমতাচ্যুত করে এবং ক্ষমতাহীন অবস্থায় কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হয়ে  মারা যায়। জগৎ শেঠ স্বরুপচাঁদ দুই জনকেই মীর কাসেম হত্যা করে। তাদের মধ্যে জগৎ শেঠকে দূর্গের চূড়া থেকে গঙ্গায় নিক্ষেপ করে হত্যা করা হয়। রায়দূর্লভকে কারাগারে বন্দী করা হয় সেখানেই মারা যায়। উমিচাঁদ প্রতারণার স্বীকার হয়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘোরে মৃত্যুবরণ করে। রাজা রাজবল্লাভ পদ্মায় ডুবে মর্মান্তিকভাবে মারা যায়। মীর কাসেম ইংরেজদের সাথে তারও বিরোধ বাধে অজ্ঞাত স্থানে মারা যান। ইয়ার লতিফ খান যুদ্ধে পর তাকে মেরে ফেলা হয় বলে ধারণা করা হয়। মহারাজা নন্দকুমার তহবিল তছরুপ অন্যান্য অভিযোগে অভিযুক্ত হন বিচারে নন্দকুমারের ফাঁসির রায় হলে ফাঁসিকাষ্ঠে তার মৃত্যু হয়েছিল। ষড়যন্ত্রের আরেক মূলহোতা ঘষেটি বেগমকে মীরজাফরের বড় ছেলে মিরনের (অনেক অপকর্মের হোতা) নির্দেশে নৌকা ডুবিয়ে হত্যা করা হয়। দানিশ শাহ বা দানা শাহ  যে কিনা নবাবাকে ধরিয়ে দিয়েছিল বিষাক্ত সাপের কামড়ে তার মৃত্যু হয়। রবার্ট ক্লাইভের মৃত্যু আরও ভয়বহ। তিনি নিজ বাড়ির বাথরুমে গলায় ছুড়ি চালিয়ে আতœহত্যা করেন। মুহাম্মদী বেগ বিনা কারণে কূপে ঝাঁপ দিয়ে মারা যায়।

পলাশী থেকে বর্তমান:
বিশ্বাসঘতকতা আর অদূরদর্শীতার জন্য আমাদেরকে পুনরায় খোঁজে পেতে সময় লেগেছে প্রায় দুইশত বছর। পলাশীর ঘটনার খলনায়কেরা আজ আমাদের কাছে না থাকলেও তাদের উত্তরসূরিরা আজও দেশ জাতি নিয়ে গভীর ষড়যন্ত্র করছে। পলাশীর হৃদয়বিদারক ট্রাজেডি থেকে আমাদেরকে শিক্ষা নিয়ে সকল ষড়যন্ত্র কূটকৌশলের বিরোদ্ধে দাঁড়াতে হবে ঐক্যবদ্ধভাবে। আসুন জাতিকে রাজনৈতিক নিপীড়ণ, অর্থনৈতিক শোষণ, সাংস্কৃতিক  গোলামীর জিঞ্জীর থেকে রক্ষা করে প্রত্ত্বয়ে স্বমহিমায় উদ্ভাসিত হই।

1 comment:

  1. ভাল হয়েছে, তবে লেখার মান আর ও উন্নত করতে হবে।ধন্যবাদ।।

    ReplyDelete