Wednesday, 14 March 2018

পলাশীর হৃদয়বিদারক দিন ও ষড়যন্ত্রকারীদের নির্মম পরিণতি


আমাদের দায় পলাশী :
২৩ জুন ঐতিহাসিক পলাশী দিবস। আজকের প্রজন্ম যেখানে নিকটবর্তী ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ভুলতে বসেছে অথবা তাদেরকে আসল ইতিহাস বাদ দিয়ে অন্য এক ইতিহাসের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে তখন তো ১৭৫৭ সালের পলাশী ট্রাজেডির ব্যাপারে কোন কথাই নেই। যেখানে ৫২ ভাষা আন্দোলন নিয়ে প্রশ্ন করা হলে আগামীর কর্ণধার  প্রজন্ম বলে এক মহা যুদ্ধের কথা সেখানে তাদেরকে যদি বলা হয় পলাশীর আম্রকাননের কথা তাহলে ঢাকার আজিমপুরের পাশে পলাশী নামক স্থানের কথা ছাড়া খুব বেশি যে বলতে পারবে তা মনে হয় না। এর পেছনে অবশ্য কারণও রয়েছে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার অপরিণত পরিবর্তন , অসুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ, অতিমাত্রায়  রাজনীতিকীকরণ, অন্যের অনুসারে পরিচালিত জীবনাচার সামাজিক সমচেতনতাবোধের অভাব। কারণের পেছনের কারণ খোঁজা হলে হয়তবা আরও অনেক ব্যকরণ উঠে আসবে কিন্তু তা না করে জাতির সামগ্রীক চেতনাবোধের জায়গাকে আরও পরিশীলিত করার জন্য প্রয়োজন এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন। জাতিকে তার আসল ইতিহাস সম্পর্কে সজাগ করা ইতিহাসের নির্মম পরিণতি সম্পর্কে সচেতন করা। এক্ষেত্রে জনগণের দায়িত্বশীল হিসেবে সরকারকেই এগিয়ে আসতে হয় প্রথম।

ইতিহাস কথা বলে :
ইতিহাস নাকি সব সময় বিজয়ীদের পক্ষেই থাকে। কথা কিন্তু সত্য - তবে ইতিহাস কিন্তু নিজেকে (ইতিহাসকে) অস্বীকার করে না। বিজয়ীদেরকে যেমন নায়কের ভুমিকায় দেখায় আবার বিজয়ের নেপথ্যে হীনকাজ কারবারীদেরকে খলনায়কের ভুমিকায় নামিয়ে আনে। ২৩ জুনের ইংরেজদের বিজয়ের জন্য নায়কের ভুমিকায় থাকা মীর জাফরকে ইতিহাসই আজ টেনে হিঁচড়ে নায়কের জায়গা থেকে নামিয়ে যোজন যোজন দূরত্বে নিয়েছে। তাকে আজ ঘৃণাভরে স্মরণ করা হয়। এমনকি মানুষ মানুষকে গালি দেওয়ার সময় তার নাম উচ্চারণ করে। অপরদিকে পরাজয়ের গ্লানিমাথায় নির্মম মৃত্যুর পরও ইতিহাস নায়কের  আসনে সমাসীন করেছে বাংলা, বিহার, উরিষ্যার শেষ নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাকে। নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা আজ এক মাথা উঁচু রাখা বীরের নাম।

অস্তমিত স্বাধীনতার সূর্য্য:
মূলত আলীবর্দী খাঁর থেকেই নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার অধ্যায় শুরু। নাবাব আলীবর্দী খানের কোন পুত্র সন্তান ছিল না। এদিকে তাঁর (নবাব আলীবর্দী খানের ) সিংহাসণারোহণের স্বল্প সময়ের ব্যবধানে মারা যায় তার এক দৌহিত্র দ্ইু জামাতা। তাই তিনি মৃত্যুর পূর্বেই তার কনিষ্ঠ কন্যার পুত্র প্রিয় দৌহিত্র সিরাজউদদৌলোকে বাংলার পরবর্তী নবাব মনোনীত করে যান। ১৭৫৬ সালের ১০ই এপ্রিল ৮০ বছর বয়সে নবাব আলীবর্দী খাঁন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার পর ১৭৫৬ সালের এপ্রিল মাসে তারই মনোনীত প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র সিরাজ-উদ-দৌলা সিংহাসনে বসেন মাত্র তেইশ বছর বয়সে। একদিকে তার অল্প বয়স অপরদিকে তার সিংহাসণারোহণের কারণে অনেকের সিংহাসণারোহণের স্বপ্ন ধুলিস্যাৎ হয়ে যাওয়া দেখে তার বিরোদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হয়। ষড়যন্ত্রকারীদের মধ্যে নবাব আলীবর্দী খাঁর জ্যেষ্ঠা কন্যা মেহেরুন্নেসা ওরফে ঘসেটি বেগম অন্যতম। অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রের সুযোগে ইংরেজরা তাদের কূটকৌশলকে কাজে লাগায়। ষড়যন্ত্রকারী শওকত জঙ্গ ঘসেটি বেগমের পক্ষাবলম্বন করে নবাবকে চিরাচরিত রীতি অনুযায়ী কোন উপঢৌকান পাঠানো থেকে বিরত থেকেই ক্ষান্ত হয় নি বরং ইংরেজদের ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নবাবের অবাধ্য সবাইকে আশ্রয় প্রদান করে। ইউরোপে সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধের (১৭৫৬-১৭৬৩) অজুহাতে ইংরেজ ফরাসি বণিকরা বাংলায় দুর্গ নির্মাণ শুরু করে। নবাব সংবাদ জানতে পেরে তাদের নিরস্ত্র হতে এবং দুর্গ নির্মাণ বন্ধ করার আদেশ দেন। ফরাসিগণ নবাবের নির্দেশ মত দুর্গ নির্মাণ বন্ধ করলেও উদ্ধত ব্রিটিশ বণিকরা নবাবের আদেশ তো মানেইনি ; উপরন্তু তাঁর দূতকে তারা অপমান করতেও দ্বিধা করেনি। ইংরেজ নাবাবের মধ্যে ষড়যন্ত্রকারীদে মাধ্যমে দূরত্ব বাড়তে থাকলে তিনি ষড়যন্ত্রকারীদের মূল হোতা তার খালা ঘসেটি বেগমকে আটক করেন। সময় ইংরেজরা নবাবের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের ব্যাপারে আগ্রহী হলেও তারা দূর্গ নির্মাণ বন্ধের কোন তৎপরতা দেখায় নি। ১৭৫৭ সালে ইংরেজদের সাথে সমন্বয় করে ২৩ এপ্রিল কোলকাতা পরিষদ নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাকে ক্ষমতাচ্যুত করার প্রস্তাব করে। ইংরেজ সেনাপতি রবার্ট ক্লাইভ গোপন আতাঁত করে সিরাজ-উদ দৌলার সেনাপতি মীরজাফরের সাথে। নবাব তা বুঝতে পেরে মীরজাফরকে পদ থেকে অপসারণ করলে কূটকৌশলে পারদর্শী মীরজাফর কুরআন ছুয়ে শপথ গ্রহণ করে নিজ পদ ফেরৎ পায়। সমসাময়িক ঐতিহাসিকরা বলেন, এই ভুল সিদ্ধান্তই নবাব সিরাজের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। ঘটনার পরম্পরায় মীরজাফরের সিংহাসন লাভের বাসনা ইংরেজদের পুতুল নবাব বানানোর পরিকল্পনা, ঘষেটি বেগমের সাথে ইংরেজদের যোগাযোগ, নবাবের নিষেধ সত্ত্বেও ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ সংস্কার কাজ অব্যাহত রাখা, কৃষ্ণ বল্লভকে ফোর্ট উইলিয়ামে আশ্রয় প্রদান প্রভৃতি কারণে ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশীর আমবাগানে সকাল সাড়ে ১০টায় ইংরেজ নবাবের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। নবাব সিরাজ-উদ- দৌলার পক্ষে ৫০,০০০ সৈন্য অংশ গ্রহণ করে ইংরেজদের হয়ে মাত্র তিনহাজার সৈন্য অংশ নেয়। ইংরেজ কর্তৃক পূর্ণিয়ার শওকত জঙ্গকেসাহায্য করা, মীর মদন মোহনলালের বীরত্ব সত্ত্বেও জগৎশেঠ, রায় দুর্লভ, উমির চাঁদ, ইয়ার লতিফ প্রমুখকুচক্রী মহলের প্রাসাদ ষড়যন্ত্র   বিশ্বাসঘাতকতার ফলে নবাবের পরাজয় ঘটে। সেইসাথে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য  পৌনে দু বছরের জন্য অস্তমিত হয়।

বিশ্বাসঘাতকদের করুণ পরিণতি:
অস্বাভাবিক মৃত্যু বিচারহীন মৃত্যু কারই কাম্য না হলেও ইতিহাস তার নিজস্ব ব্যবস্থার মাধ্যমে কখনো কখনো ফয়সালা নিয়ে থাকে এভাবে দেখলে কিছু বিষয়কে ব্যাখ্যা করা যায় এভাবে যে- ইতিহাস বিশ্বাসঘাতকদের ক্ষমা করে নি। যারা বিশ্বাবসঘাতকতা করেছে তাদের মৃত্যু স্বাভাবিক হয় নি। মীর জাফর- সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে বিশ্বাসঘাতকতার। সে সামান্য সময়ের জন্য নবাব হলেও তাকে তার জামাতা মীর কাসেম ক্ষমতাচ্যুত করে এবং ক্ষমতাহীন অবস্থায় কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হয়ে  মারা যায়। জগৎ শেঠ স্বরুপচাঁদ দুই জনকেই মীর কাসেম হত্যা করে। তাদের মধ্যে জগৎ শেঠকে দূর্গের চূড়া থেকে গঙ্গায় নিক্ষেপ করে হত্যা করা হয়। রায়দূর্লভকে কারাগারে বন্দী করা হয় সেখানেই মারা যায়। উমিচাঁদ প্রতারণার স্বীকার হয়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘোরে মৃত্যুবরণ করে। রাজা রাজবল্লাভ পদ্মায় ডুবে মর্মান্তিকভাবে মারা যায়। মীর কাসেম ইংরেজদের সাথে তারও বিরোধ বাধে অজ্ঞাত স্থানে মারা যান। ইয়ার লতিফ খান যুদ্ধে পর তাকে মেরে ফেলা হয় বলে ধারণা করা হয়। মহারাজা নন্দকুমার তহবিল তছরুপ অন্যান্য অভিযোগে অভিযুক্ত হন বিচারে নন্দকুমারের ফাঁসির রায় হলে ফাঁসিকাষ্ঠে তার মৃত্যু হয়েছিল। ষড়যন্ত্রের আরেক মূলহোতা ঘষেটি বেগমকে মীরজাফরের বড় ছেলে মিরনের (অনেক অপকর্মের হোতা) নির্দেশে নৌকা ডুবিয়ে হত্যা করা হয়। দানিশ শাহ বা দানা শাহ  যে কিনা নবাবাকে ধরিয়ে দিয়েছিল বিষাক্ত সাপের কামড়ে তার মৃত্যু হয়। রবার্ট ক্লাইভের মৃত্যু আরও ভয়বহ। তিনি নিজ বাড়ির বাথরুমে গলায় ছুড়ি চালিয়ে আতœহত্যা করেন। মুহাম্মদী বেগ বিনা কারণে কূপে ঝাঁপ দিয়ে মারা যায়।

পলাশী থেকে বর্তমান:
বিশ্বাসঘতকতা আর অদূরদর্শীতার জন্য আমাদেরকে পুনরায় খোঁজে পেতে সময় লেগেছে প্রায় দুইশত বছর। পলাশীর ঘটনার খলনায়কেরা আজ আমাদের কাছে না থাকলেও তাদের উত্তরসূরিরা আজও দেশ জাতি নিয়ে গভীর ষড়যন্ত্র করছে। পলাশীর হৃদয়বিদারক ট্রাজেডি থেকে আমাদেরকে শিক্ষা নিয়ে সকল ষড়যন্ত্র কূটকৌশলের বিরোদ্ধে দাঁড়াতে হবে ঐক্যবদ্ধভাবে। আসুন জাতিকে রাজনৈতিক নিপীড়ণ, অর্থনৈতিক শোষণ, সাংস্কৃতিক  গোলামীর জিঞ্জীর থেকে রক্ষা করে প্রত্ত্বয়ে স্বমহিমায় উদ্ভাসিত হই।

আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস ও ইসলামী ভাবনা


১লা মে আমাদের মাঝে প্রতি বছর ফিরে আসে। তবে অন্যান্য তারিখের মতো করে নয় একটু ভিন্নভাবে। ফিরে আসে হাহাকার নিয়ে, মেহনতি মানুষের কাজের দাবি নিয়ে, তাদের কাজের যথাযথ স্বীকৃতি নিয়ে। কিন্তু তাদের যথাযথ মর্যাদা কি আমরা দিতে পেরেছি?  আমরা কি তাদেরকে মানুষের কাতারে রাখছি শুধুমাত্র কিছু আনুষ্ঠনিকতা ছাড়া? তবুও ১লা মে এর আনুষ্ঠানিকতা কম কিসে! আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শ্রমিক দিবস (International Workers Day) হিসেবে পরিচিত ১লা মে শ্রমজীবী  মানুষের কাজের স্বীকৃতির দিনটি ১৮৯০ সাল থেকে পালিত হয়ে আসছে। সারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন সংগঠন নানা আয়োজনের মাধ্যমে গুরুত্ব সহকারে পালন করে শ্রমিক দিবস। শ্রমিক দিবস তথা মে দিবস খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষের ঘর্মাক্ত প্রতিচ্ছবির কথা মনে করিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি মনে করিয়ে দেয় তাদের রক্তাক্ত ইতিহাসের যে ইতিহাসের আনুষ্ঠানিকতা আছে কিন্তু তার কোন যথাযথ বাস্তাবায়ন নেই।

মে দিবসের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস :
১২৭ বছর আগের শ্রম ইতিহাস। তখনও সূর্য উদয় থেকে সূর্যাস্থ ১২ ঘন্ট বা তার  চেয়ে বেশি পরিশ্রম করতে হতো শ্রমিকদেরকে। হারভাঙ্গা খাটুনির বিনিময়ে ভাগ্যে জোটতো শোষণ-নিপীড়ন বঞ্চনা। সীমাহীন নির্যাতন, স্বল্প মজুরী মানবিক অধিকারহীনতা প্রভৃতি নিয়ে যেখানে একা একাই টিকে থাকা কষ্ট সেখানে রয়েছে পরিবার পরিজনের ভরণপোষণ। অন্যদিকে শ্রমিকের মাথায় কাঁঠাল ভেঙ্গে গড়ে ওঠতো পুঁজিপতি শ্রেণীর সম্পদের পাহাড়। এসবের বিরোদ্ধে আমেরিকাতে প্রথমবারের মতো প্রতিবাদ ওঠে ১৮৮৪ সালের অক্টোবর, যার মূল দাবি ছিল ১২ঘন্টার পরিবর্তে ঘন্টা শ্রম। কিন্তু দাবিতে কার যায়-আসে? ফেডারেশন অব লেবার এর দাবিতে কোন মালিকশ্রেণীতো কর্ণপাত করলইনা বরং তারা শ্রমিক নির্যাতনের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিল। ফলে এক সময় শ্রমিকের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ বিস্ফোরণের আকার ধারণ করল। বিস্ফোরণমুখ এরুপ পরিস্থিতিতে কাজের সময় ১২ ঘন্টার পরিবর্তে ঘণ্টা নির্ধারণ করা, মজুরির পরিমাণ বাড়ানো এবং কাজের উন্নত পরিবেশ তৈরি করাসহ শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায়ের লক্ষে ১৮৮৬ সালের পয়লা মে আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটে শিল্পশ্রমিকেরা ধর্মঘটের ডাক দেয়। ব্যাপক সাড়া পাওয়া যায় শ্রমিকদের কাছ থেকে। ধর্মঘটে যোগ দেন লাখ শ্রমিক। তারা কলকারখানা বন্ধ রেখে নেমে এলেন রাজপথে। মালিকশ্রেণীর শোষণের বিরোদ্ধে গড়ে ওঠা ধর্মঘটকে সহজভাবে নেয় নি সমাজপতিরা। তারা তাদের নির্যানতনকে দীর্ঘস্থায়ী করার লক্ষে প্রশাসনেকে আহবান করে ধর্মঘট মোকাবিলা করার জন্য। মালিকদের প্রত্যক্ষ মদদে প্রশাসন শ্রমিকদের ডাকা ধর্মঘটে হামলা চালায়। ধর্মঘটে পুলিশি হামলার প্রতিবাদে মে একই স্থানে শ্রমিকদের সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়। এতে বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত শ্রমিকরা যোগ দেয়।  মালিকশ্রেণী শ্রমিকদের আন্দোলনকে দমন করার জন্য হীন স্বড়যন্তে মেতে ওঠে। তারা তাদের সন্ত্রাসীদেরকে লেলিয়ে দিয়ে বোমা হামলা করে পুলিশ সদস্যকে মেরে ফেলে যার খেসারত আবার শ্রমিকদেরকে দিতে হয়। প্রশাসন শ্রমিকদের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে সমাবেশে নির্বিচারে গুলি চালায় এতে ১১জন শ্রমিক মারা যায়। শ্রমিক নেতৃবৃন্দসহ অসংখ্য শ্রমিকের নামে মামলা করা হয়। আটক করা হয় অনেক শ্রমিক নেতাকে। শুধু তাই নয় অভিযুক্তদেরকে বিচারের নামে সাজানো হয় নাটক। প্রহসণের বিচারের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ শ্রমিকনেতাসহ ফাঁসি কার্যকর করা হয় জনের। এতকিছুর পরও শোষণের বিরোদ্ধে গড়ে ওঠা আন্দোলন দমিয়ে রাখা যায় নি। তা ছড়িয়ে পড়ে সার দুনিয়ায়। শিকাগোর রক্তাক্ত ঘটনার উত্তাপ সকল যায়গায় ছড়িয়ে পড়ায় ঘন্টা কাজের দাবি আদায় হয়।  শিকাগোর আন্দোলনের বছর পর ১৮৮৯ সালে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক শ্রমিক কংগ্রেসে রক্তঝরা শিকাগোর শহীদদের স্মরণ রাখার লক্ষে ১দিন সংহতি দিবস পালনে সিদ্ধান্ত হয় এবং ১লা মে দিন ঠিক হয়। ফলে ১৮৯০ সাল থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শ্রমিকেরা মে দিবসটিকে আন্তার্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে পালন করে আসছেন।

বাংলাদেশে মে দিবস :
বিশ্বয়নের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশেও মে দিবসের ছোঁয়া লাগে তৎকালীন ব্রিটিশ শাসনামলেই। ১৯৩৮ সালে নারায়নগঞ্জে প্রথম মে দিবস পালন করা হয়। পাকিস্তান আমলে দিবসটি পালন করা হলেও ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের কাছ থেকে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে বিপুল উৎসাহ উদ্দিপনার মাধ্যমে মে দিবস পালন করা হয় এবং বছরই সরকারী ছুটি ঘোষণা মে দিবসকে পালন করার আবহকে বাড়িয়ে দেয়। আজপর্যন্ত মে দিবস বিভিন্ন সংগঠন বিভিন্নভাবে পালন করে যাচ্ছে।

ইসলামে শ্রমের মর্যাদা:
শ্রম আন্দোলনের দীর্ঘ ১২৭ বছর পেরিয়ে গেলেও শ্রমজীবী মানুষদের মুক্তি মিলেছে এরকম কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় নি এখনও। ঘন্টা কাজের নিয়ম প্রতিষ্ঠা হলেও শ্রমজীবী মানুষরা তাদের অধিকার সত্যিকার অর্থে ফিরে পায় নি। থামেনি নিপীড়ণ, অত্যাচার, জুলুম নির্যাতন। প্রতিষ্ঠিত হয় নি মালিক শ্রমিক কল্যানমূলক সম্পর্ক। তবে দেড়হাজার বছর পেছনে তাকালে দেখা যাবে একমাত্র ইসলামই শ্রমিকের যথাযথা মর্যাদা অধিকার উপলব্ধি করতে পেরেছিল এবং যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণে সক্ষম হয়েছিল। মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা:) খেটে খাওয়া মানুষের কষ্ট বুঝতে সক্ষম হয়েছিলেন এবং তিনি যে ঐশ্বরীক বিধান চালু করেছিলেন তাতে শ্রমিক শ্রমের মহিমা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তাঁর অমোঘ বাণী জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আজও সারা দুনিয়ার মানুষের কাছে অতুলনীয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।তোমরা যা খাবে তা তাদেরকেও খাওয়াবে তোমরা যা পরবে তা তাদেরকেও পরতে দেবে বলে যে অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছিলেন তা ইতিহাসে নজিরবিহীন। কোন দার্শনিক তার লোকদের জন্য এরকম কথা বলার সাহস পান নি।  শ্রমজীবী মানুষেরা সমাজের বিচ্ছিন্ন কোন অংশ নয় বরং তার সে সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ ব্যাপারেও মুহাম্মদ (সা:) এর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল এরকম যে -‘যারা তোমাদের কাজ করছে তারা তো তোমাদেরই ভাই। আল্লাহ তাদেরকে তোমাদের অধীনস্থ করে দিয়েছেন। সুতরাং তাদের ব্যাপারে ব্যাবহারে নমনীয় হওয়ার কথা বলতে গিয়ে তিনি আরও বলেছেন-‘তোমরা অধীনস্থদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে এবং তাদেরকে কোন রকমের কষ্ট দেবে না। তোমরা কি জান না, তাদেরও তোমাদের মতো একটি হৃদয় আছে। ব্যথা দানে তারা দুঃখিত হয় এবং কষ্টবোধ করে। আরাম শান্তি প্রদান করলে সন্তুষ্ট হয়। তোমাদের কী হয়েছে যে,  তোমরা তাদের প্রতি আন্তরিকতা প্রদর্শন কর না। শ্রমিকের মজুরির বিষটির পূর্বেই আসে তার মানবিক অধিকারের বিষয়টি। ব্যাপারেও তিনি উদাসি ছিলেন না বরং শ্রমিকের মানবিক দিক বিবেচনায় তিনি দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করে বলেছেন- ‘মজুরদের সাধ্যের অতীত কোন কাজ করতে তাদের বাধ্য করবে না। অগত্যা যদি তা করাতে হয় তবে নিজে সাহায্য কর। মালিকের প্রতি শ্রমিককে তার অধিকার নিশ্চিত না করার পরিণাম সম্পর্কে বলতে গিয়ে মহানবী (সা) কঠোর বাণী উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন তিন ব্যক্তির বিরোদ্ধে আমি কঠিন অভিযোগ উপস্থাপন করব-যে ব্যক্তি আমার কাউকেও কিছু দান করার ওয়াদা করে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করল, যে কোন মুক্ত স্বাধীন ব্যক্তিকে বিক্রয় করে তার মূল্য আদায় করল এবং যে ব্যক্তি অন্যকে নিজের কাজে নিযুক্ত করে পুরোপুরি কাজ আদায় করে নিলো, কিন্তু তার মজুরি দিলো না-ওরাই সেই তিনজন। শ্রমিকের প্রতি মালিক যাতে সহনশীল থাকে এবং তার ভুলত্রুটি ক্ষমার মতো মহৎ মনের অধিকারী হয়, সেই বিষয়টি নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়ে আল্লাহর নবী (সা) এক হাদীসে বলেছেন, ‘মজুর চাকরদের অপরাধ অসংখ্যবার ক্ষমা করা মহত্ত্বের লক্ষণ। অসদাচরণকারী মালিকদেরকে সতর্ক করে মহানবী (সা) আরো বলেছেন, ‘অসদাচরণকারী মালিক বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না। শ্রমিকের মজুরি আদায়ের ব্যাপারে মহানবী (সা) এর অতি পরিচিত এবং বিখ্যাত একটি উক্তি সম্পর্কে সবার জানা থাকার কথা। তিনি বলেছেন, ‘মজুরকে তার গায়ের ঘাম শুকাবার আগেই মজুরি পরিশোধ করে দাও। শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে মহানবী (সা) এর এই বাণী শ্রমিকের মর্যাদার বিষয়টিকে আরো বেশি মহীয়ান করেছে। এছাড়াও শ্রমিক যেন তার কাজে ফাঁকি না দেয় সে ব্যাপারে অনেকবার রাসূল (সা:) আলেকপাত করেছেন। এভাবে ইসলাম শ্রমিকের মর্যাদা অধিকার প্রতিষ্ঠার যে গ্যারান্টি দিয়েছে, তা দুনিয়ার মানুষের তৈরি করা আর কোনো মতবাদ বা দর্শন দেয়নি। আধুনিক বিশ্বের পুঁজিবাদী সমাজবাদী রাষ্ট্র দর্শনের কোনটাই শ্রমিকের প্রকৃত অধিকার মর্যাদার ন্যূনতম সমাধান দিতে  তো পারেইনি বরং জটিল সমস্যার সমাধানের প্রচেষ্ঠায় নতুন নতুন সমস্যার উদ্ভব করেছে। ফলে এখনও শ্রমিক-মজুররা নিষ্পেষিত হচ্ছে। মালিকের অসদাচরণ, কম শ্রমমূল্য প্রদান, অনপযুক্ত কর্ম পরিবেশ কাজ করতে বাধ্য করা সহ নানা বৈষম্য শ্রমিকের দুর্দশা মানবেতর জীবনযাপনের কারণ হয়ে আছে।

অবশেষে বলা যায় শুধু শ্রমিক দিবস পালন করার মাধ্যমেই শ্রম অধিকার বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। বর্তমানে যেভাবে শ্রমিক দিবস পালন করা হয় এভাবে পালনে শ্রমিকদের কোন লাভ নেই তা তে  দেখাই যাচ্ছে। যে অধিকার আদায়ের জন্য শিকাগোতে শ্রমিকরা জীবন দিয়েছিল তা বাস্তবে এখনও অধরাই রয়ে গেছে। আজও শ্রমিকরা পায়নি তাদের কাক্সিক্ষত পরিবেশ বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা, যথাযথ মজুরি। শ্রমিকদের অধিকার প্রদান করতে হলে প্রয়োজন সুন্দর একটি মন একটি পরিবেশ এবং একটি সমাজ। যে সমাজ হবে ইসলামের আদলে যে সমাজ হবে মানবতার কল্যাণে সে সমাজ হবে মানুষের জন্য। আসুন আমরা সে সমাজের নাগরিক হই যে সমাজে কোন শ্রমিক নির্যাতিত হবে না কোন শ্রমিক তার প্রাপ্য অংশ থেকে বঞ্চিত হবে না। যে সমাজে কোন শ্রমিক তার অধিকারের জন্য আন্দোলন করতে হবে না। সে প্রত্যাশায় শ্রমিক দিবস সফল হউক।